খেলাধুলা ডেস্কঃ আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের সেই ছোট্ট ছেলেটিরও আর দশজনের ফুটবল খেলতে ভীষণ ভালো লাগতো। কিন্তু একটা জায়গায় সে ছিলো অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফুটবলটাকেই সে করেছিল সাধনার মহামন্ত্র, ধ্যানের মতো নিয়েছিল জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে। আর সেই ছেলেটির নাম লিওনেল মেসি।
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন রোজারিওতে জন্ম মেসির। শৈশব থেকেই বল পায়ে তার জাদু দেখা যেত। বয়স যখন মাত্র পাঁচ, তখনই লোকাল ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে খেলতে শুরু করেন। পরে যোগ দেন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে।
কিন্তু ফুটবলে যতটা দ্রুত ছুটছিলেন মেসি, তার শরীর যেন ততটা দ্রুত বাড়ছিলো না। মাত্র ১১ বছর বয়সে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি। যে বয়সে অন্য শিশুরা নিশ্চিন্তে মাঠে ছুটছে, সেই বয়সে মেসির পরিবারকে ভাবতে হচ্ছে চিকিৎসার খরচ নিয়ে। প্রতিমাসে প্রয়োজন ছিল ব্যয়বহুল চিকিৎসার। পরিবারের পক্ষে সেই খরচ চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না।
আর তখনই মেসির জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামনে। অনেকেই বলতে শুরু করেন, এত ছোট গড়নের একটা ছেলে কি সত্যিই বড় ফুটবলার হতে পারবে?
কারো মতো উত্তরটা ছিল স্রেফ ‘না’। কিন্তু ফুটবলকে যিনি সাধনার মন্ত্র মানেন, তিনি অতো সহজে হাল ছাড়েন না। পায়ের বলটাই যেন শরীরের সীমাবদ্ধতা মানতে চাইত না।
এরপর মেসির জীবনে ঘটে সবচেয়ে বড় নাটকীয় ঘটনা।
২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি পাড়ি দেন স্পেনে। লক্ষ্য, বার্সেলোনার একাডেমিতে সুযোগ পাওয়া। কিন্তু বার্সেলোনার কর্মকর্তারাও প্রথমে সন্দিহান ছিলেন। ছেলেটার প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ ছিল না, কিন্তু বয়স, শারীরিক গঠন আর চিকিৎসার খরচ সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত এক রেস্তোরাঁয় বসে ঘটে যায় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ঘটনা। বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ একটি ন্যাপকিনে লিখে দেন, মেসিকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই সঙ্গে এক টুকরো ন্যাপকিনেইও পর লেখা কয়েকটি লাইন বদলে দেয় ফুটবল ইতিহাস। বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় শুরু হয় মেসির নতুন জীবন।
সেখানে ধীরে ধীরে সবাই বুঝতে শুরু করলেন, ছেলেটা শুধু প্রতিভাবান নয়, অসাধারণও বটে। বল পায়ে তার গতি, ড্রিবলিং, শরীরের ভারসাম্য আর গোল করার ক্ষমতা ছিল অন্যরকম। ২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে মেসির অভিষেক হয়। তারপর রূপকথার লিখতে শুরু করেন এলএম টেন। একটার পর একটা গোল। একটার পর একটা রেকর্ড। একের পর এক ট্রফি।
তবে সবকিছুর পরও মেসির গল্পে শুধু সাফল্য ছিল না, ছিল নিঃসঙ্গতাও। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন খুব শান্ত, লাজুক আর অন্তর্মুখী স্বভাবের। মাঠে যে মানুষটা কয়েকজন ডিফেন্ডারকে একসঙ্গে বোকা বানিয়ে দিতেন, মাঠের বাইরে সেই মানুষটাই ছিলেন ভীষণ চুপচাপ। আর জাতীয় দলের জার্সিতে তার পথটা ছিল আরও কঠিন।
আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে গিয়ে তাকে বারবার শুনতে হয়েছে, ক্লাবে যত বড় তারকা, জাতীয় দলের হয়ে ততটা সফল নন। অনেকে তো মেসিকে স্বার্থপরও ডাকতে শুরু করেছিলেন। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, তারপর ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরপর দুই হার। হতাশ হয়ে মেসিও হাল ছেড়িছিলেন, ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছেন।
তবে নিয়তি যার গল্প লেখার ভার নেয়, তার গল্প এমন মাঝপথে থামে না কিছুতেই। যেখান থেকে মনে হয় সব শেষ হয়ে গেছে, সেখান থেকেই হয় নতুন শুরু। অবসর ভেঙে ফেরা মেসি আরও বাড়ালেন ধার,পায়ের জাদু আর নেতৃত্বের গুণে ২০২১ সালে ব্রাজিলের মারাকানায় আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা জেতালেন। মেসির হাতে উঠল প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। অনেক বছরের অপেক্ষার পর দেশের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা।
কিন্তু এরপরও একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। মেসি কি বিশ্বকাপটা জিততে পারবেন? ঠিক তার মাঝেও এলো আরেকটা ধাক্কা ২০২১ সালেই তাকে ছাড়তে হলো প্রিয় ঘর বার্সেলোনা। ক্লাবটির সঙ্গে দুই দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের ইতি টানলেন তিনি। বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তিনি কাঁদলেন, কাঁদালেনও।
যে ক্লাবের একাডেমিতে কিশোর বয়সে এসেছিলেন, যে ক্লাবকে নিজের ঘরের মতো মনে করতেন, সেই বার্সেলোনাকেই শেষ পর্যন্ত বিদায় বলতে হয়েছিল।
এরপর মেসির নতুন অধ্যায় শুরু হয় প্যারিসে। কিন্তু তার চোখ তখন এক জায়গাতেই, কাতার। বিশ্বকাপের অধরা স্বপ্ন পূরণে তখন তিনি আরও মগ্ন। বিশ্বকাপের শুরু আর্জেন্টিনার স্বপ্নের মতো হলো না। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচেই হার। অনেকেই তখন আবার প্রশ্ন তুললেন, মেসির বিশ্বকাপের স্বপ্ন কি এবারও অপূর্ণই থেকে যাবে?
কিন্তু মেসি যেন এবার অন্য কিছু ঠিক করে এসেছিলেন, মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল; পোল্যান্ডের বিপক্ষে জয়। এরপর অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া; প্রতিটি ম্যাচে মেসি দলটাকে টেনে নিলেন একাই।
আর তারপর এল ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, লুসাইল স্টেডিয়াম। এক পাশে আর্জেন্টিনা। অন্য পাশে ফ্রান্স। মাঠে মেসি আর এমবাপ্পের দ্বৈরথ। বিশ্বকাপের ফাইনাল যেন একটা সিনেমার শেষ দৃশ্য হয়ে থাকল। আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল। মেসি গোল করলেন। ডি মারিয়া গোল করলেন। মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপটা বুঝি আর্জেন্টিনারই। কিন্তু ফ্রান্স ফিরে এল। এমবাপ্পে করলেন একের পর এক গোল। ৯০ মিনিট শেষ। অতিরিক্ত সময়ও শেষের পথে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে।
সেই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীর চোখ মেসির দিকে। আর তারপর... আর্জেন্টিনা জিতে গেল। মেসির হাতে উঠল সেই ট্রফি, যেটার জন্য তিনি বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও চলেছে মেসির ঝলক; একাই দলকে টেনে নিয়েছেন ফাইনালে; যদিও সোনালি শিরোপা ছোঁয়া হয়নি; তবুও মেসির মাহাত্ম্য কমেনি মোটেও। ৩৯ বছরে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তাতেই অবাক হয়ে গেছে বিশ্ব, মুগ্ধতা নিয়ে দেখেছে কেবল তাকেই। এবার এলো বিদায়ে মাহেন্দ্র ক্ষণ, আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই। তারপও কথা থেকে যায়; যে জীবন ফুটবলের, তাকে কি আসলে অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি আছেন, থাকবেন; বিদায় নামের তিন শব্দেও মুছবে না তার পায়ের ছাপ।
<p style="text-align: center; box-sizing: inherit; -webkit-font-smoothing: antialiased; margin: 0px 0px 23.1px; padding: 0px; border: 0px; vertical-align: baseline; font-size: 15px; font-family: SolaimanLipi, Arial, sans-serif; word-break: break-word; overflow-wrap: break-word; color: rgb(192, 192, 192); background-color: rgb(15, 15, 17);">সম্পাদকীয়ঃ ৫১৬/2 ইসিবি চত্বর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। ঢাকা ১২০৬</p><p style="text-align: center; box-sizing: inherit; -webkit-font-smoothing: antialiased; margin: 0px 0px 23.1px; padding: 0px; border: 0px; vertical-align: baseline; font-size: 15px; font-family: SolaimanLipi, Arial, sans-serif; word-break: break-word; overflow-wrap: break-word; color: rgb(192, 192, 192); background-color: rgb(15, 15, 17);">ফোন নাম্বারঃ 01711475448</p><p style="text-align: center; box-sizing: inherit; -webkit-font-smoothing: antialiased; margin: 0px; padding: 0px; border: 0px; vertical-align: baseline; font-size: 15px; font-family: SolaimanLipi, Arial, sans-serif; word-break: break-word; overflow-wrap: break-word; color: rgb(192, 192, 192); background-color: rgb(15, 15, 17);">জিমেইলঃ Dainikbanglasomoy@gmail.com</p>
Copyright © 2025 All rights reserved