
বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়ানো অভিযোগ, গুঞ্জন আর নীরব প্রশ্নের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সরকারের নিজের প্রকাশিত গেজেটেই উঠে এলো ভয়াবহ এক দুর্নীতির চিত্র। লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. সাইফুজ্জামানকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা এই প্রজ্ঞাপন শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এক দুর্নীতির লিখিত স্বীকারোক্তি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪ এ কর্মরত থাকাকালে মো. সাইফুজ্জামান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পে গুরুতর অনিয়মে জড়ান। প্রকল্পটির W-1 প্যাকেজের আওতায় ‘অনাবাসিক ভবন’ সংক্রান্ত একটি কাজ অনুমোদিত ডিপিপি (DPP), সংশোধিত ডিপিপি (RDPP) কিংবা HOPE অনুমোদন ছাড়াই বেআইনিভাবে আটটি আলাদা প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এরপর ই-জিপি পদ্ধতির মাধ্যমে এসব ভাঙা প্যাকেজে আলাদা আলাদা দরপত্র আহ্বান করা হয়।
এই কৃত্রিম প্যাকেজ বিভাজনের মাধ্যমে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। তদন্তে উঠে আসে, এটি কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে অর্থ আত্মসাতের একটি পরিচিত কৌশল। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এই পদ্ধতিকে অনেকেই চেনেন “এক প্যাকেজ ভেঙে কমিশনের বন্যা” নামে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো—এই আটটি প্যাকেজের বিপরীতে বাস্তবে কোনো কাজের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। কোনো ভবন নির্মাণ হয়নি, ব্যবহার হয়নি ইট, রড বা কংক্রিট। বাস্তব কাজ শূন্য, অথচ কোটি কোটি টাকার বিল অনুমোদন ও পরিশোধ করা হয়েছে। সরকারি তদন্তে একে সরাসরি “কাজ না করেই বিল উত্তোলন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও গুরুতর বিষয় হলো, প্রকল্পটির জন্য নির্ধারিত মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (NDEL)-কে পাশ কাটিয়ে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে অন্য আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে বিল পরিশোধ করা হয়। এই অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে প্রকৌশলীর ক্ষমতার অপব্যবহার করে। তদন্ত প্রতিবেদনে এটিকে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, গুরুতর অনিয়ম এবং প্রশাসনিক বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সরকারি গেজেটে প্রকাশিত আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৯(১) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেই আইনের ভিত্তিতেই ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে মো. সাইফুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো অভিযোগের গল্প নয়—সরকার নিজেই লিখিতভাবে স্বীকার করেছে যে এখানে দুর্নীতি হয়েছে।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়। এই ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা কি একজন নির্বাহী প্রকৌশলী একাই আত্মসাৎ করেছেন? তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক, হিসাব শাখা এবং বিল অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা তাহলে কী করছিলেন? ই-জিপির মতো ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার হলেও এসব ভুয়া টেন্ডার কীভাবে যাচাই ছাড়াই অনুমোদন পেল—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অজানা।
মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি “সিস্টেমেটিক দুর্নীতি কাঠামো”-এর ছোট একটি অংশ। আজ একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বরখাস্ত হয়েছেন, কিন্তু যদি পুরো প্রকল্প, পুরো সার্কেল কিংবা পুরো সিন্ডিকেট খতিয়ে দেখা হয়, তাহলে সামনে আসতে পারে আরও বহু কাগুজে উন্নয়ন আর শত শত কোটি টাকার লুটপাটের তথ্য।
গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, টাকার অঙ্ক নির্দিষ্ট, অপরাধের বিবরণ পরিষ্কার। এখন দেখার বিষয় একটাই—এই বরখাস্তের পর সত্যিকারের তদন্ত, অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং দায়ীদের শাস্তি হবে, নাকি সবকিছু আবার নীরবে ফাইলের ভেতর ঢুকে পড়বে?
<p style="text-align: center; box-sizing: inherit; -webkit-font-smoothing: antialiased; margin: 0px 0px 23.1px; padding: 0px; border: 0px; vertical-align: baseline; font-size: 15px; font-family: SolaimanLipi, Arial, sans-serif; word-break: break-word; overflow-wrap: break-word; color: rgb(192, 192, 192); background-color: rgb(15, 15, 17);">সম্পাদকীয়ঃ ৫১৬/2 ইসিবি চত্বর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। ঢাকা ১২০৬</p><p style="text-align: center; box-sizing: inherit; -webkit-font-smoothing: antialiased; margin: 0px 0px 23.1px; padding: 0px; border: 0px; vertical-align: baseline; font-size: 15px; font-family: SolaimanLipi, Arial, sans-serif; word-break: break-word; overflow-wrap: break-word; color: rgb(192, 192, 192); background-color: rgb(15, 15, 17);">ফোন নাম্বারঃ 01711475448</p><p style="text-align: center; box-sizing: inherit; -webkit-font-smoothing: antialiased; margin: 0px; padding: 0px; border: 0px; vertical-align: baseline; font-size: 15px; font-family: SolaimanLipi, Arial, sans-serif; word-break: break-word; overflow-wrap: break-word; color: rgb(192, 192, 192); background-color: rgb(15, 15, 17);">জিমেইলঃ Dainikbanglasomoy@gmail.com</p>
Copyright © 2025 All rights reserved